পাহাড়ি পথের বাঁকে

0
61

বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম।

খুব গুছিয়ে আয়োজন করে বা দীর্ঘ পরিকল্পনায় কখনো ভ্রমণে বের হওয়া হয় না আমার। যখনই  কোথাও গিয়েছি ক্ষণিকের প্রস্তুতিতেই চলে গিয়েছি। এখনও এমনই আছি। হোস্টেল জীবন থাকায় আবহাওয়ার অনুকূল-প্রতিকূল নয়; বরং সুযোগের অপেক্ষায় থাকা। যখনই ফুরসত মেলে দল বেঁধে বেরিয়ে যাওয়া।

এক পড়ন্ত নিকেলের ধূমায়িত আড্ডায় ঘুরতে বেরুবার আওয়াজ উঠল। কোথায় যাওয়া যায়- এ নিয়ে চলে কথার চালাচালি। শেষে স্থির হয় বান্দরবন। ১৭ আদমের এক বহর। বহরই বটে। সতেরোজনের একটা দল যখন দূরে কোথাও ঘুরতে যায়, তখন একে বহর না বললে অন্যায় হয়।পরিকল্পনাহীন ভ্রমণ মানেই হুটহাট আয়োজন। রাতারাতি মোটামুটি  পথচেনা গাইড ও  অবস্হানস্হলসহ নানা দিক নিয়ে আলোচনা আর সিদ্ধান্ত হয়ে যায়। খুব ভোরে শুরু হবে পথ চলা….

Promotion

ভয়, উৎকণ্ঠা,সাহস আর রোমাঞ্চে ভরা বান্দরবন। ভয় আর উৎকণ্ঠা হয় ভ্রমণে সঙ্গী। কেননা রাতেই জানা হয়ে গেছে আঁকাবাঁকা সর্পিল পাহাড়ি পথের কথা।

দেশের যে প্রান্ত থেকেই আপনি বান্দরবন যেতে চান, বন্দরনগরী চট্টগ্রামে  আসতেই হবে আপনাকে।আমরাও চট্টগ্রামের বদ্দারহাট টার্মিনাল থেকে  প্রায় ৭৫ কি.মি. দূরের বান্দরবনে পৌঁছি আড়াই-তিন ঘন্টার জার্নি শেষে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি বান্দরবনে পৌঁছেই সোজা চলে যাই আল্লামা শাহ হাজী মুহাম্মদ ইউনুস রহ. কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘ ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র ‘ পরিদর্শন ও সবক অর্জনে।

যে কথা না বললেই নয়-

বাংলাদেশের ভৌগলিক পরিসরের দিক থেকে দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে বিস্তৃত এলাকাজুড়ে রয়েছে সুদীর্ঘ পর্বতশ্রেণী ও ঘন অরণ্য। এ পার্বত্য এলাকা তিনটি আলাদা আলাদা জেলায় বিভক্ত। তন্মধ্যে বান্দরবন পার্বত্য জেলা  অন্যতম। এ জেলাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঘন শ্যামলিমার আকর্ষণীয় সমাহার ও রককমারি উপভোগ্য দৃশ্যের কারণে একটি প্রসিদ্ধ পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। শহর অঞ্চলের আশেপাশেই এ জেলার সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের বসবাস।

বাংলাদেশে পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসরত জাতি-গোষ্ঠিসমূহ মুর্খতা, দারিদ্র, বেকারত্ব ও নানাবিধ কারণে সীমাহীন কঠিন পরিস্হিতি ও দুরবস্থার শিকার। যদিও বাংলাদেশ সরকার এতদঞ্চলের সাধারণ শিক্ষা-কার্যক্রম, স্বাস্হ্যপ্রকল্প বাস্তবায়ন এবং তাদের জীবনমান উন্নয়নের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে। তাদের জন্য একটি স্হনীয় প্রশাসন ব্যবস্হাও গড়ে তুলেছে। কিন্তু তাদের পর্যাপ্ত ধর্মীয় জ্ঞানে পরিপূর্ণ  করে তোলার মতো সরকারি বা বেসরকারি কোনো উদ্যোগই গ্রহণ করা হয় নি। তাছাড়া সরকারের সীমিত সামর্থ্যের কারণে এ বিশাল এলাকায় সমানভাবে এ উদ্যোগ কার্যকর করতে সক্ষমও নয়। এহেন পরিস্থিতিতে পাহাড়ি অধিবাসীদের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় এই পশ্চাৎপদতাকে পুঁজি করে অমুসলিম মিশনারি সংস্হা এক কুটিল ফাঁদ পেতে দেয় বিস্তৃত এলাকাজুড়ে।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, কেবল বান্দরবন পাহাড়ি এলাকাতেই অমুসলিম মিশনারিরা অসংখ্য মিশনারি তৎপরতার মাধ্যমে ইসলামধর্মাবলম্বী সরলমনা মুসলমানকে ত্রিত্ববাদের দীক্ষা দিচ্ছে। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান রিপোর্ট অনুসারে পাহাড়িদের সর্বকনিষ্ঠ উপজাতি লুসাই সম্প্রদায় পুরোপুরি  খ্রিস্টান হয়ে গেছে। আর কিছু গোত্রের ৪৫%,৬০%,২০%,১০% হারে খ্রিস্টানধর্মে দীক্ষিত হয়েছে।

এ হলো গত এক যুগের কথা। এখন তো আরো ভয়ানকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে মিশনারিদের কার্যক্রম। এ অঞ্চলগুলোকে কেন্দ্র করে পাহাড়ে গড়ে উঠছে এক বিদেশি চক্রীয় সাম্রাজ্য। এই দিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যই নজর দেয়া জরুরি। পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠিসমূহ বিভিন্ন কারণে উগ্র মনোভাব পোষণ করে রাষ্ট্রের প্রতি। তাদের ক্ষুদ্র অঞ্চলকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতির দাবি প্রায়ই শোনা যায়। এই অবস্থায় মিশনারিরা তাদেরকে অর্থ-সেবা ও শিক্ষা দিয়ে ধর্মান্তকরণের মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিজেদের অনুগত করে গড়ে তুলছে। সবার অজান্তেই গড়ে উঠছে ভিন্নমতাবলম্বী একটা গোষ্ঠি।

ভাবতে অবাক লাগে, যখন মিশনারিরা সবেমাত্র বাংলাদেশে প্রবেশ করতে শুরু করেছে তখনই বান্দরবনে ইসলামী শিক্ষা, দাওয়াত ও সুবিধাবঞ্চিত জনগণকে আর্থিক সহযোগিতা দেয়ার জন্য একটি বহুমুখী বিশাল প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন হাজী মুহাম্মদ ইউনুস রহঃ।

১৯৮৯ সনে শুরু হয় কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠার শুভলগ্ন। তাঁর ‘জীবন, কর্ম ও অবদান’ গ্রন্থে পঠিত বিষয়াবলী মনের পর্দায় দৃশ্যমান হয়ে উঠছিল।একজন দুনিয়াবিমুখ দরবেশ আলেমের বিষয় জ্ঞান, সতর্কতা ও শৃঙ্খলাবোধ সব সময়ই এমনই হয়। মাদরাসায় কিছুকাল অবস্থান বিশ্রাম সেরে বের হলাম শহর চষে বেড়াতে।

দুজন গাইড পেলাম সেই প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায়। স্থানীয় একজন চালকও পেয়ে গেলাম খুব সহজেই। পরদিন নীলগিরি হয়ে থানচি যাবার কথা এবং ভাড়া ঠিকঠাক করে ফেললাম গাইড আর গাড়ির সাথে।

বান্দরবন ভ্রমণে চান্দের গাড়িতে করে না গেলে জমে ওঠে না ভ্রমণানন্দ।

সকাল সকাল হাঁকালাম গাড়ি নীলগিরির পথে। পথে শৈলপ্রপাত ও চিম্বুক দেখলাম। এ পথে বাহন হিসেবে চান্দের গাড়িকেই পারফেক্ট মনে হলো।

আঁকাবাঁকা উঁচুনিচু সর্পিল পাহাড়ি পথ। দক্ষ চালক না হলে এ পথে গাড়ি চালানো কঠিন। শহর থেকে নীলগিরির দূরত্ব ৫৫ কিলোমিটার। পাহাড়ের পাশ কেটে গা চিড়ে অত্যন্ত কঠিন পরিশ্রমে এ পথ তৈরি করেছে আমাদের সেনাবাহিনী। পথের একপাশে খাড়া পাহাড়, আরেকপাশে গভীর খাদ। চালকের একটু ভুল ডেকে আনতে পারে ভয়াবহ পরিণতি। গাড়ির চাকা পিছলে গেলে সোজা কয়েকশো ফুট নিচে…ভাবতেই মেরুদণ্ডের মাঝখান দিয়ে শীতল প্রবাহ বয়ে যায়। পথের দুই পাশে জানা অজানা গুল্ম, লতাগুল্ম আর গাছের সারি। মাথার ওপর নীল আকাশ। দূরে পাহাড়চূড়ায় সাদা মেঘ খেলা করছে। মেঘেরা যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। আমরাও আস্তে আস্তে মেঘের রাজ্যে প্রবেশ করছি।

বান্দরবন শহর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে পাথুরে ঝর্ণা  শৈলপ্রপাত। মূল সড়ক থেকে সিঁড়ি বেয়ে নামতে হয় এ ঝর্ণায়। প্রচুর পানি, খুবই ঠাণ্ডা। পাহাড়ি শিশুরা ঝর্ণার পানিতে খেলা করে। উপজাতি নারীরা গোসল শেষে কলসি ভরে পানি নিয়ে যায়। ঝর্ণার পানিতেই পাহাড়িরা সারেন প্রয়োজনীয় রান্নাবাড়া।

বান্দরবন শহর থেকে বাংলার দার্জিলিং চিম্বুকের দূরত্ব ২৫ কিলোমিটার। ভূমি থেকে ২৫০০ ফুট উচ্চতার এ পাহাড়চূড়ায় উঠলে মেঘ ছুঁয়ে দেখা যায়। তাই প্রকৃতিপ্রেমিদের অনেকেই বাংলার দার্জিলিং বলতেই তৃপ্তিবোধ করেন চিম্বুককে। পর্যাপ্ত আধুনিক সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে চিম্বুকের সৌন্দর্য সে দার্জিলিংয়ের চেয়ে কোনো অংশে কম হতো না।

গাড়িতে চড়েই চিম্বুকচূড়ায় ওঠা যায়। তবে বর্ষার সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ।

পাথুরে ঝরণা শৈলপ্রপাত, বান্দরবন।

বান্দরবন শহর থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে নীলগিরি। প্রায় ঘন্টা দেড়েক সময় লাগে। এখানে দু’পাশে গভীর খাদে মেঘেরা ভেসে বেড়াচ্ছে। এ দৃশ্য দেখতে খোলা ছাদের চান্দের গাড়ির বিকল্প নেই। তবে নীলগিরির চারদিকে সুনসান নীরবতা। শুধু চূড়ায় সেনাক্যাম্পে কর্মরত সেনারা। নীলগিরিতে এ রকম জনহীন পরিবেশ আপনাকে মুগ্ধ করবে।

নীলগিরিরর রূপমাধুর্য লিখে শেষ করবার নয়। ভূমি থেকে এর উচ্চতা ৩ হাজার ফুট। উচ্চতার কারণে শীত ও বর্ষায় বান্দরবন বেড়ানোর সব’চে আকর্ষণীয় জায়গা এটি। তবে বর্ষায় তা হয়ে ওঠে আরো আদরনীয়, প্রার্থনীয়। এর চারপাশে মেঘেরা খেলা করে। এখানে দাঁড়িয়ে নিচে পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সাঙ্গু নদীর অপরূপ সৌন্দর্য দেখা যায়। মনে হয় সরু ফিতার মতো।

যারা প্রকৃতির এই খেলা খুব কাছ থেকে দেখতে চান, তারা একটা রাত থেকে যান সেনাবাহিনী পরিচালিত কটেজে।

খাবারের জন্য রয়েছে ভালো মানের রেস্টুরেন্ট। এখানে বসে পেটপুরে খেতে খেতে ডানে-বাঁয়ে চোখ বুলালে দূর-বহুদূরে দেখা যায় দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাহাড় কেওক্রাডং।

নীলগিরি হয়ে পাহাড়ি পথের শেষ, বাংলাদেশের সড়ক পথের ইতি যেখানে।

সে হলো থানচি। এখান থেকে ট্রলারে করে দুতিন ঘন্টা পর্যন্ত যাওয়া যায় পাহাড়ি ঝর্ণার সন্ধানে। এ পথে বেশ ক’টি ঝর্ণার দেখা মেলে।

পাহাড়ের গাম্ভীর্য আর বিশালতার ছাপ জেঁকে বসে এই পথে। চরম উৎকণ্ঠা আর সাহসই এ পথের সঙ্গী।

নীলগিরি, বান্দরবন।

নীলগিরি থেকে থানচি যাবার পাহাড়ি পথটাই সব’চে রোমাঞ্চকর। কখনও উপর থেকে নিচের পথটা দেখলে মনে হয় এই বুঝি পড়ে গেলাম, আজ শেষ এখানেই।

সামনে চলার পথের দিকে তাকালে ভয় আর শংকায় বুক শুকিয়ে যায়, এত উঁচু পথে উঠবে কি করে গাড়ি !  নাকি গড়িয়ে নিচে পড়ি। এমনই হাজারো ভীতি কাজ করে ভেতরে, পথের বাঁকে বাঁকে।

ফ্যান্টাসি কিংডমের ম্যাজিক কার্পেটের মতো পাহাড়ি পথটা কখনো আমাদের তুলে নিচ্ছে ভয়ংকর উচ্চতায় আবার ঢাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া পানির মতো নামিয়ে দিচ্ছে পাহাড়তলায়।

এভাবেই আঁকাবাঁকা উঁচুনিচু সর্পিল পথটা ছুটে চলেছে সবুজে মোড়ানো পাহাড় থেকে পাহাড়ে। বান্দরবন থেকে নীলগিরি হয়ে থানচির পথের রোমাঞ্চ আর সৌন্দর্য যে কাউকে আবিষ্ট করবে।

বান্দরবনে আরও একটি ঝর্ণা খুব সহজেই দেখে নেয়া যায়। এলাকার নামানুসারে একে বলে রেইচা ঝর্ণা। ঝর্ণার পানি খুব ঠাণ্ডা। এ পানিতে পা ভেজাতেই শরীরজুড়ে শীতল পরশ বয়ে যায়। শহরের এত কাছে এ রকম একটা ঝর্ণা রয়েছে তা ভাবাই যায় না।

এছাড়াও রয়েছে মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্স। যা সারা বছরই পর্যটকদের আনাগোনায় মুখরিত থাকে। এর আসল সৌন্দর্য পাহাড়ঘেরা সর্পিলাকার স্বচ্ছ পানির লেক ও দুটি ঝুলন্ত ব্রিজ। ব্রিজ দুটিকে লেকের এপার থেকে ওপারে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। এর ওপর দিয়ে যাওয়া দারুণ আনন্দের। একপাশে খাঁচায় বন্দি করে রাখা হয়েছে বেশ কিছু পশু-পাখি।

প্রবেশ পথের সিঁড়ি ভেঙ্গে নিচে নামতেই চোখে পড়বে উপজাতি এক নেতার স্মৃতি সংগ্রহশালা।

সন্ধেটা উপভোগ করতে পারেন বান্দরবনের স্বর্গভূমি খ্যাত নীলাচলে। অন্য রকম ভ্রমণের অভিজ্ঞতা হবে অবশ্যই।

বান্দরবন হচ্ছে বাংলাদেশের যে কয়টি পর্যটন স্পট আছে তার শীর্ষ সারিতে। যদি ভ্রমণপিয়াসু এবং এডভেঞ্চার-রোমাঞ্চপ্রিয় হোন, তাহলে আপনার জন্য এক আদর্শ জায়গা বান্দরবন। একবার ঘুরে এলে মনে হবে ভ্রমণ স্বার্থক। আমরাও এমন এক অনুভূতি ও তৃপ্তি নিয়ে সবশেষে রওয়ানা দিলাম ফেরার পথে।

LEAVE A REPLY