মেঘালয়ের পাশে

0
12

এই পৃথিবীর কিছু কিছু মানুষ ভ্রমণ খুব ভালোবাসে। সম্ভবত আমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত। ভ্রমণ আমার পছন্দের একটি। ২০১৬ সালের মার্চের মাঝামাঝি সময়ে ঠিক হয় আমরা বিছানাকান্দি যাবো। বিছানাকান্দি সম্পর্কে যা জেনেছি বা ফটোতে যতটুকু দেখেছি, তাতে আমার বিছানাকান্দি র প্রতি যথেষ্ট আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। আমরা মার্চের ১৮ তারিখ চললাম বিছানাকান্দি  ভ্রমণে।

চমৎকার সব ব্যবস্তা করেন ফয়সাল ভাই। গাড়ি থেকে শুরু করে দুপুরের নাস্তা পর্যন্ত। লোকটার প্রশংসা করতে হয়! সকাল আটটায় আমাদের গাড়ি চলতে শুরু করে। তখন কেবল হালকা রোদ ওঠেছে। আমরা যাচ্ছি কোন একটা চা বাগানের ভিতর দিয়ে। সকালের মিষ্টি রোদের ছোঁয়ায় সবুজ সবুজ চা কুঁড়িগুলোকে চমৎকার লাগছে। আমাদের গাড়িতে যাত্রীসংখ্যা এগারোজন। সবাই বিছানাকান্দির যাত্রী। এদের মধ্যে আমি চিনি মাত্র তিনজনকে। আব্দুল হামিদ ভাই, ফয়সাল ভাই এবং সালমানকে। বাকি সবাই আমার অপরিচিত। কিন্তু এক পথের যাত্রীদের পরিচয় হতে কতক্ষণ?

Promotion

আমাদের গাড়িতে একজন শিল্পী আছেন। তাকেও আমি চিনি না। একটু পর সবাই তাকে গান গাওয়ার জন্য অনুরোধ শুরু করে। কিন্তু তিনি অটল। গান গাইবেন না। অবশেষে গাড়িতে গান প্লে করা হলো। গান ভ্রমণকে আরো আনন্দদায়ক করে। আমরা হায়দারঘাট বাজারে পৌঁছি প্রায় দশটায়। হায়দারঘাট বাজার থেকে বিছানাকান্দি আরো প্রায় দুই কিলোমিটার। কিন্তু গাড়ি আর যাবে না। এখানে গাড়ি পার্কিং করা হবে। বাকি পথ আমাদের হেঁটে হেঁটে পাড়ি দিতে হবে। অবশ্য এখান থেকে নৌকা চলে। কিন্তু এখন নৌকা পাওয়া যাবে না। কারণ এখন ফাল্গুনমাস। বর্ষার মতো পানি নেই।

সকাল সাড়ে দশটার দিকে আমরা পথে নামলাম। মাথার উপরে দুপুরের উত্তপ্ত সূর্য। নিচে বিছানো বালু। আমরা ধীরে ধীরে হাঁটছি। কখনো দৌড়ে ধুলো উড়িয়ে আমাদের পাশ কেটে যাচ্ছে ট্রাক্টর। আমরা ধুলো-বালু থেকে বাঁচার জন্য নাকে দেই। এই ট্রাক্টরগুলো বালু আর পাথর বোঝাই। বিছানাকান্দি  খনন করে বোঝাই করে বাজারে নিয়ে আসা হয়। আমাদের সাথে আমাদের মতো অনেক পথিক, যারা বিছানাকান্দি  ঘুরতে যাচ্ছেন।

একটু হাঁটার পর দেখলাম, দূরে যেন একখণ্ড মেঘ মাটিতে নেমে পাহাড় হয়ে আছে। আমরা উত্তেজিত। কারণ মেঘখণ্ডের কাছে যাচ্ছি। প্রায় ৪০ মিনিট হাঁটার পর পৌঁছলাম বিছানাকান্দিতে। পাথর আর ছোট একটা নদীর পানি বহমানে বিছানাকান্দি। পাশেই দাঁড়ানো মেঘালয় পাহাড়। দূর থেকে দেখা মেঘখণ্ড মূলত এই মেঘালয়। বিছানাকান্দি  বাংলাদেশ এবং ভারতের বর্ডারে অবস্থিত। ভালো করে লক্ষ করলে দেখা যায় ওপারে উড়ানো লাল সুতা।

প্রতিদিন আসেন অনেক পর্যটক। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেতে ভ্রমণপিপাসুরা এসে ভিড় করেন। আমরা বিছানাকান্দিকে দেখছি। এ পাথর থেকে ও পাথরে যাচ্ছি। এদিকে ওদিকে হেঁটে দেখছি। কখনো পানিতে নিজেকে ডুবাচ্ছি। সারা পথের ক্লান্তি মুহূর্তে ভুলে যাই। কেউ বিছানাকান্দিকে ক্যামেরায় ধারণার চেষ্টা করছে। ফটো-সেলফি তুলছে হরদম। এই তো আসার সময় সালমান বলল তার ক্যামেরায় নাকি এক হাজার সাতাইশটা ফটো জমা হয়েছে। মনে মনে বললাম, মারহাবা! চর্ম চোখে কি একবার বিছানাকান্দিটাকে দেখা হয়েছে?

একটা পরিবারের সঙ্গে কথা হলো। তারা ঢাকা থেকে এসেছেন। তাদের ছেলে আগে দেখে গিয়ে মা-বাবা বোনকে পাঠিয়েছে। প্রৌঢ় লোকটা অনেক কথা বললেন। সিলেটে আর কোথায় কোথায় পর্যটন স্থান জানতে চাইলেন। কজন তরুণকে দেখলাম। সবারই গায়ে নীল টি-শার্ট। সম্ভবত অনেক প্ল্যান নিয়ে ওদের ঘুরতে আসা।

দুপুর হেলে পড়ার পর সবাই যেন ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। এত উত্তপ্ত রোদে ভর দুপুর কাটালে ক্লান্ত হওয়াটা স্বাভাবিক। সবাই বলতে লাগল, এবার ফেরা যাক। সবাই নিজ নিজ ব্যাগ গুছাতে শুরু করে। আমরা ফিরতে পা বাড়ালাম। আমি মনে মনে বললাম, আবার আসব হে বিছানাকান্দি, আবার আসব। আবার এক বর্ষায় আসব। নৌকা চড়তে চড়তে আসব। আরো এক ঝাঁক ভ্রমণপিপাসুদের নিয়ে আসব।

LEAVE A REPLY